‘র‍্যানডম এক্সেস মেমরি’ টার্মটার সাথে আমরা সবাই খুব বেশি একটা পরিচিত না থাকলেও এর শর্ট ফর্ম ‘র‍্যাম’ এর সাথে কিন্তু আমরা সবাই বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। যাই হোক, এই র‍্যানডম এক্সেস মেমরি হচ্ছে কম্পিউটারের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট। স্পেশাল এই টার্ম মূলত ইন্ডিকেট করে এক প্রকারের মেমরিকে যার সাহায্যে আমরা আমাদের কম্পিউটারে করা কাজগুলোকে দিতে পারি কিছুটা গতিও। প্রশ্ন করতে পারেন, ‘মেমরি তো এক প্রকারের স্টোরেজ, তাহলে সেটা কীভাবে স্পিড আপ করতে সক্ষম?’ হ্যাঁ, আপনার এই প্রশ্নটির উত্তরও এই ব্লগটিতে পেয়ে যাবেন। বর্তমানে খেয়াল করলে দেখবেন বাজারে যে সকল কম্পিউটার বা সিমিলার ডিভাইস পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোতে র‍্যামের পরিমাণ ভ্যারি করছে ২ গিগাবাইট থেকে ১৬গিগাবাইট পর্যন্ত। এর উপরেও আছে তবে সেগুলো মূলত ক্লোন পিসির ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। তো এখন আজকের মূল প্রশ্নে চলে যাওয়া যাক, “আসলে কতটুকু র‍্যাম আমাদের দরকার?”

আপনার মূলত কতটুকু র‍্যাম মেমরি প্রয়োজন তা নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর,

  • আপনি ঠিক কতটুকু কাজ করতে চান, এবং
  • আপনার এর পেছনে কতটুকু অর্থ ব্যয় করার ইচ্ছা রয়েছে।

এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণই কম্পিউটার বা এরকম ডিভাইসগুলোকে ফোকাস করে তৈরি করা হয়েছে যেগুলোতে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে রয়েছে যেকোনো ডেস্কটপ অপারেটিং সিস্টেম যেমন ধরুন, উইন্ডোজ, ম্যাক ওএস এক্স, লিনাক্স বা ক্রোম ওএস।

র‍্যানডম এক্সেস মেমরি বা র‍্যাম সম্পর্কে কিছু বেসিক আলোচনা

র‍্যামের এই মেমরি ক্যাপাসিটি অনেক সময়ই তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে কিছু লং-টার্ম স্টোরেজ ডিভাইসের সাথে যেমন সলিড স্টেট ড্রাইভ বা মেকানিক্যাল হার্ড ড্রাইভের সাথে। আপনার হয়তো ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হতে পারে কিন্তু বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা অনেক সময় ম্যানুফ্যাকচারার অথবা রিটেইলারদেরও এই সমস্যাটি হয়ে থাকে, তারা এই টার্মগুলোকে মিক্স-আপ করে ফেলে। এখন আমরা যারা জানি বিষয়টি সম্পর্কে বা সেকেন্ডারি আর প্রাইমারী স্টোরেজের পার্থক্য সম্পর্কে তারা তো জানিই, কিন্তু অনেকেরই এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নাও থাকতে পারে। তাই, আমি ছোট্ট একটি ডেস্ককে উদাহরণ স্বরূপ ব্যবহার করবো।

ধরুন, আপনার সামনে একটি ডেস্ক রয়েছে। এখন ডেস্কের উপরের অংশটি যেখানে আপনি বিভিন্ন কিছু রাখেন সেটিকে যদি আমরা র‍্যাম ধরি তাহলে ব্যাপারটা বোঝা খুবই সহজ হয়ে যায়। যত বড় এই ডেস্কের উপর অংশটি হবে ঠিক তত বেশি আপনি এই ডেস্কটির উপর প্রয়োজনীয় কাগজ ছড়িয়ে রাখতে পারবেন এবং খুব সহজেই প্রয়োজনের সময় সঠিক কাগজটি বের করে পড়তে পারবেন। অন্যদিকে, ধরি সেই ডেস্কে কিছু ড্রয়ার রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে আমাদের সেকেন্ডারি স্টোরেজ ডিভাইস, যেমন – সলিড স্টেট ড্রাইভ বা মেকানিক্যাল হার্ড ড্রাইভ। যতগুলো ড্রয়ার থাকবে বা ড্রয়ারে যত বেশি জায়গা থাকবে তত বেশি কাগজ আমরা ড্রয়ারটিতে সংগ্রহ করতে পারবো।

আপনার কম্পিউটারের সিস্টেমে যত বেশি র‍্যাম থাকবে আপনার সিস্টেমটি তত বেশি প্রোগ্রাম একই সাথে হ্যান্ডেল করতে সক্ষম হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে শুধুমাত্র র‍্যামই মুখ্য নয় এবং টেকনিক্যালি আপনার সিস্টেমে কম র‍্যাম থাকলেও আপনি ইচ্ছেমত প্রোগ্রাম খুলে রাখতে পারবেন কিন্তু অবশ্যই সেরকম করলে আপনার সিস্টেমটি স্লো হয়ে যাবে। কেন? আবার সেই ডেস্কের কথা চিন্তা করুন। যদি আপনার ডেস্কের উপরের জায়গাটি ছোট হয় তবে আপনি বেশি সংখ্যক কাগজ এর উপর ছড়িয়ে রাখতে পারবেন না, সেক্ষেত্রে একটির উপর একটি আপনাকে রাখতে হবে। ফলে, প্রয়োজনের সময় খুব দ্রুত সঠিক কাগজটি বের করতে আপনাকে অনেকগুলো কাগজের মধ্যে থেকে কাগজটি খুঁজে বের করতে কিছুটা সময় অপচয় করতে হবে। তাই, সিস্টেমের সাথে তুলনা করলে আপনিও ‘স্লো’ হয়ে যাচ্ছেন, তাই না? যদি একটি বড় ডেস্ক হতো তবে আপনি হয়তো আরও ছড়িয়ে আরও বেশি সংখ্যক কাগজ এর উপর রাখতে পারতেন, ফলে এর মধ্যে থেকে একটি কাগজ বের করতে আপনার কম সময় লাগতো। আশা করি, সহজ এই উদাহরণটি সহজেই আপনি বুঝতে পেরেছেন।

একটি বেশি র‍্যাম যুক্ত কম্পিউটার সিস্টেমে আপনি কাজ করার সময় আপনার মনে হতে পারে যে আপনার সিস্টেমটি ফাস্ট পারফর্ম করছে, আর যদি অনেকগুলো প্রোগ্রাম একই সাথে খুলে রাখেন তাহলে এই ধারণাটিই হয়ে যায় প্রবল! কিন্তু, মূল ফ্যাক্ট হচ্ছে বেশি মেমরি মানেই কিন্তু প্রসেসিং স্পিড আপ হওয়া নয়। এক্ষেত্রে আপনার দরকার একটি ফাস্টার সিপিইউ! আবার, বেশি র‍্যাম মানেই যে আপনার কম্পিউটারটিতে বেশি সংখ্যক প্রোগ্রাম বা ডকুমেন্ট রাখা যাবে তাও কিন্তু নয়! সেটা সেকেন্ডারি স্টোরেজের কাজ! আশা করি, র‍্যাম সম্পর্কিত কনফিউশন থাকলে এ পর্যায়ে আরও ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছেন।
আবার স্ট্যান্ডার্ড মেমরিকে ভিডিও মেমরির সাথেও অনেকে মিশিয়ে ফেলে। কিন্তু, ভিডিও মেমরি একটি আলাদা কম্পোনেন্ট যা যুক্ত থাকে কম্পিউটারের ভিডিও কার্ডের সাথে। হাই-এন্ড থ্রিডি গেমসগুলো নির্ভর করে থাকে ভিডিও র‍্যামের উপর যা মূলত বোঝানো হয় GDDR3 বা এরকম টার্ম দ্বারা যেখানে র‍্যামকে বোঝানো হয় DDR3/4 এর মাধ্যমে।

র‍্যানডম এক্সেস মেমরি (2)

র‍্যাম-হ্যাভি অ্যাপলিকেশন

র‍্যাম হ্যাভি অ্যাপলিকেশন বলতে আমি সেই অ্যাপলিকেশনগুলোকে বুঝিয়েছি যেগুলো বেশি র‍্যাম রিসোর্স ব্যবহার করে থাকে। এক্ষেত্রে একটি কম্পিউটার সিস্টেমে সর্বোচ্চ র‍্যাম রিসোর্স ব্যবহার করে থাকে এর অপারেটিং সিস্টেমটি এবং এর ওয়েব ব্রাউজারগুলো। অপারেটিং সিস্টেমের র‍্যাম রিসোর্স ব্যবহার করা নিয়ে আসলে আমাদের হাতে করার কিছুই নেই কেননা এই রিসোর্স কমাতে খুবই কম টুইকস রয়েছে যেগুলো যদিও ব্যবহার করেও থাকেন খুব একটা পার্থক্য দেখতে পাবেন না তবে বেশি র‍্যাম থাকার ফলে আপনি আপনার কম্পিউটারের ওয়েব ব্রাউজারগুলোতে চমৎকার এক্সপেরিয়েন্স পেতে পারেন। যেমন ধরুন, র‍্যাম বেশি থাকলে আপনি আপনার ব্রাউজারে অনেক বেশি ট্যাব ব্যবহার করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, আপনি ব্রাউজারের মাধ্যমে যে সাইটগুলো ভিজিট করছেন সেগুলোও কিন্তু র‍্যাম ব্যবহার করে থাকে! কোন সাইট কম এবং কোন সাইট বেশি।

অন্যান্য অ্যাপলিকেশনের ক্ষেত্রে সহজে বললে যে প্রোগ্রামে কমপ্লেক্সিটি বেশি সেই প্রোগ্রামটি র‍্যাম রিসোর্স ব্যবহারও করে বেশি। উদাহরণস্বরূপ, একটি সিম্পল চ্যাট প্রোগ্রাম বা মিনিসুইপার গেমটি বলতে গেলে র‍্যাম রিসোর্সই ব্যবহার করবে না যেখানে একটি বহুল তথ্য সমৃদ্ধ এক্সেল স্প্রেডশিট অথবা একটি বড় ধরনের ফটোশপ প্রজেক্ট একাই গিগাবাইটে বা তার বেশি র‍্যাম রিসোর্স ব্যবহার করতে সক্ষম। আধুনিক ত্রিমাত্রিক গেমগুলো বেশ র‍্যাম রিসোর্স দখল করে থাকে, সাধারণত এর পরিমাণ ৩ থেকে ৪ গিগাবাইটের মত হলেও এর বেশিও ব্যবহার করে থাকে অনেক গেম।

র‍্যানডম এক্সেস মেমরি (3)

 

তো এই সকল পয়েন্টগুলো দিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে তা হচ্ছে র‍্যামের পরিমাণ নির্ভর করে আপনি যে সকল অ্যাপলিকেশন বা প্রোগ্রাম ব্যবহার করে থাকেন তার উপর। ধরুন, আপনার দুটি উইন্ডোজ কম্পিউটার রয়েছে, একটিতে রয়েছে ২ গিগাবাইট র‍্যাম এবং অন্যটিতে ১৬ গিগাবাইট, এছাড়া অন্যসব হুবহু এক। যদি দুটি কম্পিউটারেই আপনি কোন প্রোগ্রাম রান না করেন তবে তারা একই রকম কাজ করবে। পার্থক্য তখনই বুঝতে পারবেন যখন আপনি একটি বড় এক্সেল স্প্রেডশিট বা ফটোশপ প্রজেক্ট ওপেন করবেন তখন!

পিসি ট্যাবলেটের জন্য র‍্যামের পরিমাণ নির্ধারণ

বেশিরভাগ উইন্ডোজের ট্যাবলেটগুলো বাজারে পাওয়া যায় ২ গিগাবাইট থেকে ৪ গিগাবাইট র্যা৬ম সম্বলিত। এগুলো মূলত বেসিক টাস্কের জন্য পর্যাপ্ত। অল্প কিছু ব্রাউজার ট্যাব ব্যবহার করা, একটি ভিডিও দেখা, ওয়ার্ড ফাইলে বা পাওয়ার পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন রেডি করা, হালকা পাতলা গেম খেলা – ইত্যাদি কাজ বেশ ভালোভাবে করা গেলেও এই ডিভাইসগুলোতে মাল্টিটাস্কিং হতে পারে আপনার জন্য একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কারণ। কেননা, এই ডিভাইসগুলো তৈরিই করা হয়েছে হালকা টাস্কের জন্য যার জন্য ২ থেকে ৪ গিগাবাইট র‍্যাম পর্যাপ্ত।

ল্যাপটপের জন্য র‍্যামের পরিমাণ নির্ধারণ

বাজেট ল্যাপটপগুলোতে মূলত ২ গিগাবাইট থেকে র‍্যাম ব্যবহার করা শুরু হয়ে থাকে এবং মোটামুটি ৮ গিগাবাইট পর্যন্ত রেঞ্জ রাখা হয় এই ল্যাপটপগুলোতে। তবে বাজারে কিছু কিছু এক্সপেন্সিভ মডেল পাবেন যেগুলোতে ১২ অথবা ১৬ গিগাবাইট পর্যন্ত র‍্যাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই বাজেটের দিক দিয়ে চিন্তা করলে ৪ গিগাবাইট র‍্যামের একটি ল্যাপটপ পর্যাপ্ত বলা চলে তবে আপনি যদি ক্যাজুয়াল গেমের চাইতেও বেশি কিছু করতে চান যেমন ফটো এডিটিং তবে আপনার চোখ বন্ধ করে ৮ গিগাবাইট সম্বলিত ল্যাপটপ কেনা উচিত বা আপনার ল্যাপটপে র‍্যাম বৃদ্ধি করা উচিত।

ডেস্কটপ কম্পিউটারের জন্য র‍্যামের পরিমাণ নির্ধারণ

ছোট ডেস্কটপ কম্পিউটারগুলোতে (পার্সোনাল) মোটামুটি ল্যাপটপের মতই র‍্যাম থাকে, ২ গিগাবাইট বা ৪ গিগাবাইট। টাওয়ার পিসির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা আলাদা আর সবার কাছে টাওয়ার পিসি থাকেও না।

ডেস্কটপের একটি বড় সুবিধা হচ্ছে এর র‍্যামের মূল্য ল্যাপটপের র‍্যামের চাইতে বেশ কম। এজন্য বেশি র‍্যাম সমৃদ্ধ ডেস্কটপ কম্পিউটার খুব কম মূল্যেই কেনা যায়। তাই আপনি যদি আপনার প্রাইমারী কাজের জন্য ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনে থাকেন তবে ৪-৬ গিগাবাইটের মত র‍্যাম আপনার সিস্টেমের জন্য পারফেক্ট হবার কথা। যদি গেমিং পারপাসে কিনে থাকেন তবে ১২ থেকে ১৬ গিগাবাইট পর্যন্ত যেতে হতে পারে আপনার। এছাড়া কিছু ভারী কাজ যেমন অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে এর চাইতেও বেশি র‍্যামের প্রয়োজন হবে, তবে সেক্ষেত্রে পুরো সেটআপটাই হবে বেশ এক্সপেনসিভ।

র‍্যানডম এক্সেস মেমরি (1)

 

অবশ্য ডেস্কটপের ক্ষেত্রে এক কথায় বলতে হয়, ‘স্কাই ইজ দ্যা লিমিট!’ অনেক বেশি দামের কম্পিউটার সেটআপগুলোতে ৬৪ গিগাবাইট বা এর চাইতেও বেশি র‍্যাম যুক্ত থাকে। তবে বেশিভাগ ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে ইফেক্টিভলি ১৬ গিগাবাইট র‍্যাম ব্যবহার করাই কঠিন হয়ে দাড়ায়।

শেষকথা

সংক্ষেপে বলতে গেলে ২ গিগাবাইট র‍্যাম এখন ল্যাপটপ বা ট্যাবলেট পিসির জন্য নিম্নপক্ষে প্রয়োজন হয়ে থাকে কেননা উইন্ডোজ ৭ অপারেটিং সিস্টেমই খাতা কলমের হিসেবে ১ গিগাবাইটের মত র‍্যাম রিসোর্স ব্যবহার করে থাকে। ডেস্কটপ পিসিগুলোতে কমপক্ষে ৪ গিগাবাইট না হলেই নয়। আর যদি আপনি হয়ে থাকেন পাওয়ার ইউজার তাহলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন ঠিক কখন আপনার ফাঁকা র‍্যাম স্লটগুলো ফিল-আপ করতে হবে।