মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেটের প্রকৃত আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল স্টেশন ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি) নম্বর মুছে ফেলে নকল নম্বর বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছিনতাই কিংবা চুরি করা মোবাইল ফোন সেট বিক্রি করার জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা আইএমইআই মুছে ফেলার কৌশল বেছে নিয়েছেন। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড নিরাপদ করার জন্যও অপরাধীরা এ কৌশল নিচ্ছে। সিম কার্ড পরিবর্তন করা হলেও আইএমইএ নম্বর ট্র্যাক করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরে ফেলতে পারে অপরাধীদের।

নারায়ণগঞ্জে স্কুলছাত্র ইমন হত্যার প্রধান আসামি শাহাজান আলী তার ব্যবহৃত সিমকার্ড বদল করলেও পুলিশ তাকে ধরেছিল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর ট্র্যাক করে। আইএমইআই নম্বর মুছে ফেলার নতুন কৌশলের কারণে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, গত দুই-তিন মাস ধরে আইএমইআই নম্বর ট্র্যাক করার বিষয়টি বেশ চালু হয়ে গেছে। বাণিজ্যিকভাবে আইএমইআই নম্বর মুছে ফেলার কাজ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে রাজধানীর মোতালিব প্লাজায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোতালিব প্লাজার চতুর্থ তলায় ২০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকার বিনিময়ে অধিকাংশ দোকানেই আইএমইআই নম্বর মুছে ফেলা হচ্ছে। পুরানা পল্টনে স্টেডিয়াম মার্কেটের দোকানেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে বলে সূত্র জানায়। বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ফয়সাল আলিম এ ব্যাপারে বলেন, আইএমইআই নম্বর নিয়ে অনেক রকমের কারসাজি আছে।

এ কারণে প্রায় দু’বছর আগে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গ্রাহককে পুশ পুল সার্ভিসের মাধ্যমে সঠিক আইএমইআই নম্বর জানানোর প্রক্রিয়াসহ একটি প্রস্তাব বিটিআরসি’র কাছে দেওয়া হয়েছিল। এই প্রস্তাব বিবেচনা করা হলে একই আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে একাধিক হ্যান্ডসেট, আইএমইআই নম্বর মুছে ফেলা, নকল কিংবা চোরাই হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধ হয়ে যেত। প্রস্তাবটি এখন পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়নি।

আইএমইআই নম্বর মুছে ফেলা হচ্ছে যেভাবে :
মোতালিব প্লাজার চতুর্থ তলায় মোবাইল হ্যান্ডসেটের শো-রুমগুলোর বেশিরভাগেরই মোবাইল ফোন মেরামতের ব্যবস্থা রয়েছে। চতুর্থ তলায় উঠে ডানে ঘুরেই হাতের কাছের প্রথম দোকানটিতে হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর মুছে ফেলার ব্যবস্থা আছে কি-না জানালে প্রথমেই না বলে দেন বিক্রেতা। ‘অন্য দোকানে চেষ্টা করে দেখেন’। এক কথায় শেষ হয়ে যেত। দোকানি আবার ডাকলেন। কোন ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট, কোন মডেল, কয়টা সেটে কাজ করতে হবে সব জানতে চাইলেন।

স্যামসাং এবং আই ফোনের কথা জানালে তারা জানায়, করা যাবে। স্যামসাং অ্যান্ড্রয়ডের জন্য এক হাজার টাকা এবং আই ফোনের জন্য দেড় হাজার টাকা পড়বে। পরে হ্যান্ডসেট নিয়ে আসা হবে জানিয়ে সেখান থেকে কয়েক গজ দূরে আর একটি দোকানে নকিয়া পুরনো মডেলের এবং সিম্ফনি ব্র্যান্ডের পাঁচ-ছয়টি ক্ল্যাসিক হ্যান্ডসেটের কথা জানালে সেখানে বলা হয় এর জন্য তিনশ’ টাকা পড়বে। পরে দু’শ টাকায় রাজি হয়ে যায়।Mobile-Tracking-640

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে স্মার্টফোন চুরি কিংবা ছিনতাই করার পর সেগুলোতে আইএমইআই নম্বর ট্র্যাক করে ব্লক করে দেওয়া সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ থাকে। ফোন চালু করলেই দূর নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে ফোন লক করে দেওয়ার কারণে এটি আর ব্যবহার উপযোগী থাকছে না। এ কারণে চুরি কিংবা ছিনতাই হওয়া হ্যান্ডসেট বন্ধ করার পর সিম কার্ড খুলে সেট পুনরায় খোলার আগেই সফটওয়্যার ব্যবহার করে ব্ল্যাক আরএক্স১২ চিপ থেকে আইএমইআই নম্বর মুছে নতুন নম্বর বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আইএমইআই নম্বরটি বিশ্বব্যাপী একটি হ্যান্ডসেটের জন্য একটিই তৈরি হয়। ফলে প্রকৃত নম্বর কখনই প্রতিস্থাপন করা যায় না। নকল নম্বরগুলো ভুয়া। এ ছাড়া চীন থেকে আসা নিম্নমানের হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বরও বসিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ওই হ্যান্ডসেটের চেয়ে আইএমইআই নম্বর বেশি দামে বিক্রি করা যায়। আবার একই আইএমইআই নম্বর একাধিক হ্যান্ডসেটেও বসানো হয়। এর আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে একই আইএমইআই নম্বরের একাধিক চায়না হ্যান্ডসেট উদ্ধারও হয়েছে।