আপনি খেয়াল করে দেখবেন প্রযুক্তি বাজারের একেকটি ডিভাইস কোন একটি সময়ে ব্যবহারকারীদের ক্রেজ হয়ে দাঁড়ায়। তেমনি ভাবে এমন একটা সময় ছিল যখন ‘নেটবুক’ ব্যবহারকারীদের এই ক্রেজের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে সাথে বর্তমানে নেটবুক এর জনপ্রিয়তা বলতে গেলে প্রায় শূন্যের কোঠায়। যেখানে পূর্বে ব্যবহারকারীরা নেটবুক কে খুবই পছন্দ করত সেখানে বর্তমানে অবস্থা প্রায় উল্টেই গিয়েছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, নেটবুক যদিও কালের স্মৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছে তবে নেটবুক তৈরীর পেছনের সেই আইডিয়াটা কিন্তু এখনো আছে জীবন্ত এবং এর ফলেই নতুন নতুন সব চমৎকার ডিভাইস আমরা বাজারে পাচ্ছি।

নেটবুক জগতের প্রথম ডিভাইসটি ছিল Asus ব্র্যান্ডের নির্মিত Asus Eee PC যা তৈরি করা হয়েছিল ২০০৭ সালে। এবং নেটবুক এর মূল কনফিগারেশন অনুযায়ী এর মধ্যে ছিল লিনাক্স বেসড অপারেটিং সিস্টেম, একটি ছোট্ট কিন্তু দ্রুত গতি সম্পন্ন সলিড স্টেট ড্রাইভ এবং চমৎকার ব্যাটারি ব্যাক-আপ ক্ষমতা। নেটবুক এ অপটিক্যাল ড্রাইভ ছিলনা এবং মূলত নেটবুক গুলো ছিল খুবই হালকা কেননা এর স্ক্রিন প্যারামিটারও ছিল অনেক কম। মাত্র ৭” স্ক্রিন এবং ছোট্ট ক্র্যাম্পড কী-বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল নেটবুক গুলো এবং এ কারণেই তখনকার উইন্ডোজ ল্যাপটপের পাশাপাশি তুলনামূলক ভাবে অনেক হালকা এবং দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাক-সম্পন্ন এই ডিভাইসটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ব্যাপক ভাবে।

নেটবুক (5)

 

নেটবুক এর বিবর্তন

লিনাক্স বেসড অপারেটিং সিস্টেম দিয়ে নির্মিত নেটবুক প্রযুক্তি পরবর্তীতে চলে যায় উইন্ডোজের আওতায় এবং এই প্রযুক্তিতে আরও শক্তিশালী কিছু হার্ডওয়্যার সংযুক্ত করা হয়। তখন কার সময়ে উইন্ডোজের সর্বাধুনিক অপারেটিং সিস্টেম ছিল ‘উইন্ডোজ ভিসতা’ এবং ‘উইন্ডোজ ভিসতা’ এই কম ক্ষমতাসম্পন্ন নেটবুক ডিভাইস গুলোর ক্ষেত্রে খুবই ভারি ছিল যার কারণে মাইক্রোসফট নেটবুক ডিভাইসের জন্য আবারও উইন্ডোজ এক্সপিকে ব্যবহার করে। এবং কিছু কিছু ভেজালও শুরু হয়। কেননা, তখন বাজারে আসছিল এমন সব নেটবুক যেগুলোতে ছিল মেকানিক্যাল হার্ড ড্রাইভ, কম ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপটিক্যাল ড্রাইভও দেখা যেত – যেগুলো মূলত ছিল ‘ল্যাপটপ’ বা ‘নোটবুকের’ সাধারণ কনফিগারেশন। এ জন্যেই ২০০৯ সালের একটি প্রতিবেদনে CNET লিখেছিল ‘ নেটবুক ছোট এবং সস্তা নোটবুক ছাড়া আর কিছুই নয়।’

উইন্ডোজের ৭ ভার্শনটিও নেটবুক এর জন্য অপটিমাইজড করে তৈরি করা হয়েছিল যেন তা নেটবুক এবং এরকম কম শক্তিশালী হার্ডওয়্যারও সাপোর্ট করে এবং এরই ফলাফল স্বরূপ তখন বাজারে নেটবুক গুলো পাওয়া যেত ‘উইন্ডোজ ৭ এর হোম এডিশনের সাথে’।

নেটবুক ডিভাইসগুলো যে লিনাক্স বেসড অপারেটিং সিস্টেমের আন্ডারে চমৎকার কাজ করেছিল ব্যাপারটি তা নয় তবে উইন্ডোজের আন্ডারে যাবার পর তা বলতে গেলে কোন অ্যাডভান্টেজ আনতে সক্ষম হয়নি কেননা লিনাক্স বেসড অপারেটিং সিস্টেম গুলো উইন্ডোজের তুলনায় বেশ হালকা।

যাই হোক, নেটবুক গুলো মূলত শেষের দিকে ভোক্তাদের কাছে সস্তা এবং হালকা নোটবুক হিসেবেই চলত।

নেটবুক (6)

 

নেটবুক এর মৃত্যু

অনেকেই নেটবুক কিনেছিলেন কিন্তু তারা কেনার পর বেশির ভাগ সময়েই খুশি ছিলেন না কেননা নেটবুক এর কম ক্ষমতা সম্পন্ন হার্ডওয়্যারের ক্ষেত্রে উইন্ডোজের অপারেটিং সিস্টেম ছিল খুবই ভারি এবং এর ফলে ব্যবহারকারীদের অনেক রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

এক সময়ের চিত্রটা এমন হল যে না ভোক্তারা নেটবুক কিনতে চাইতেন আর না বিক্রেতারা নেটবুক বিক্রি করতে চাইতেন না, কেননা নোটবুকের বিক্রি তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলাফল স্বরূপ, নেটবুক এর প্রচলন কমতে শুরু করল।

নেটবুক (2)

 

নেটবুক এর আইডিয়া এখনও ব্যবহার হচ্ছে

নেটবুক এর জন্ম, বিবর্তন এবং মৃত্যু – তিনটিই আমি আপনাদের সামনে সংক্ষেপে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছি। যদিও আমরা শেষের দিকে নেটবুক এর করুন পরিণতি দেখলাম তবে এটা সত্যি যে নেটবুক সফলতা না পেলেও এর পেছনের আইডিয়াটা বলা চলে এখন পর্যন্ত বেশ সফল কেননা হালকা এই ডিভাইসটির আইডিয়া কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি বাজারে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় সিমিলার অনেক প্রযুক্তি পণ্য, চলুন জেনে নেয়া যাক।

১। ট্যাবলেট: নেটবুক যেমন হালকা, ছোট স্ক্রিন এবং দীর্ঘ ব্যাটারি সম্পন্ন ছিল ঠিক তেমনি আজকের ট্যাবলেট ডিভাইস গুলোও সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে। ট্যাবলেট পিসি গুলো আপনি নেটবুক এর মতই যে কোন সময় যে কোন স্থানে নিয়ে যেতে পারবেন। যদিও, ট্যাবলেটের টাচ স্ক্রিনের উপর টাইপ করাটা ততটা সুবিধার নয় তবে নেটবুক এর সেই ছোট্ট ক্র্যাম্পড কী-বোর্ডেরও একই অবস্থা ছিল।

 

 

২। আল্ট্রাবুকঃ উইন্ডোজের আল্ট্রাবুক ডিভাইস সমূহ এবং ম্যাকবুক এয়ার ডিভাইসগুলো হচ্ছে পূর্বের সেই নেটবুক এর হাই-এন্ড সংস্করণ। এই ডিভাইসগুলো এমন ভাবেই তৈরি করা হয়েছে যাতে করে ডিভাইসগুলো খুব পোর্টেবল ভাবে ব্যবহার করা যায়, এজন্যে যুক্ত করা হয়েছে দীর্ঘ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারিরও।

নেটবুক (3)

 

৩। ক্রোমবুকঃ ক্রোমবুক ডিভাইসগুলোকেই শতভাগ সর্বাধুনিক নেটবুক বলা চলে কেননা এতে উইন্ডোজ নয়, অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ব্যাবহার করা হয় লিনাক্সের একটি স্পেশাল ভার্শন, ঠিক যেমনটি আদিম নেটবুক এ ব্যবহার করা হত। এছাড়াও ক্রোমবুক গুলো অনেক সস্তা এবং হালকাও।

Chromebook Photo: Alex Washburn / Wired

 

মাইক্রোসফটও চেষ্টা করে যাচ্ছে লো-এন্ড এর ছোট ল্যাপটপ বাজারজাত করতে। এজন্যেই মাইক্রোসফট সম্প্রতি এইচপির একটি উইন্ডোজ ৮ ল্যাপটপের প্রচারণা চালাচ্ছে যার মূল মাত্র ১৯৯ ইউএসডি।

শেষকথাঃ

নেটবুক এর মূল টার্গেট ছিল কম মূল্যে সবার কাছে ছোট আকারের মোটামুটি কাজ করবে এমন ডিভাইস পৌঁছে দেয়া। আর বর্তমানে আমরা এরকম বেশ কিছু ডিভাইস পাচ্ছিও। তাই নেটবুক যে একবারে সফল নয় – এই কথাটি বলা উচিৎ হবে না, কেননা এর পেছনের আইডিয়াটাই এখনো আমদের প্রযুক্তি বাজার ব্যবহার করেই চলছে, যাতে করে আমরা উপকৃতও হচ্ছি। যাই হোক, আজ আর নয়। ভালো থাকুন, প্রিয় টেকের সাথেই থাকুন।