তারের চাইতে ঝামেলার আর কি হতে পারে? ব্লুটুথ Bluetooth হচ্ছে আমাদের এক সময়কার নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু।

আমাদের কম্পিউটার, টিভি, ডিভিডি প্লেয়ার, বাসার টেলিফোন লাইন ইত্যাদি একগাদা তারের সাথে পেঁচিয়ে থাকে।

আর এই তার গুলো দেখতে যেমন বিশ্রী—আর তেমনি ঝামেলাকর ব্যাপার। কিন্তু ব্লুটুথ (Bluetooth)

প্রযুক্তি আসার পড়ে এই তারের ঝামেলা থেকে অনেকটা নিস্তার পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

এই প্রযুক্তি অনেক সহজে আপনার সেলফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা, প্রিন্টার, পিসি এবং

অন্যান্য গ্যাজেট গুলোকে একত্রে তারবিহীন ভাবে কানেক্ট করতে সাহায্য করে।

তো চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক, এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে এবং এটি ওয়াইফাই এর তুলনায় কতটা উন্নত সেই সম্পর্কে।

ব্লুটুথ কি?

%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%a5-2

 

বন্ধুরা, আজকের দিনে আমরা প্রত্যেকেই ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকি।

রেডিও রিসিভার এবং টেলিভিশন সেট বাতাসে ছুড়ে দেওয়া ওয়্যারলেস সিগন্যালকে গ্রহন করে কাজ করে।

আপনার সেলফোন ও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক ফোন থেকে আরেক ফোনে কল বহন করে নিয়ে যায়।

এমনকি আপনার ওয়াইফাই প্রযুক্তিও একই ধারনার উপরে কাজ করে কম্পিউটার ডাটা আদান প্রদান করে থাকে।

এই সমস্ত প্রযুক্তি গুলো কিন্তু কোন কপার ক্যাবলে তথ্য বহন করে নিয়ে যায় না, এরা প্রত্যেকে

কোন তথ্য আদান প্রদান করার জন্য রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে থাকে।

ব্লুটুথ এমনি একটি রেডিও তরঙ্গের উপর কাজ করা প্রযুক্তি, কিন্তু এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে

কম দূরত্বের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে (১০ মিটার অথবা ১০ ফিট)।

সাধারনত, এই প্রযুক্তি আপনি ডিজিটাল ক্যামেরা থেকে আপনার পিসিতে ফটো ডাউনলোড করার জন্য,

আপনার ল্যাপটপের সাথে ওয়্যারলেস মাউস বা কীবোর্ড যুক্ত করার জন্য, অথবা আপনার ফোনের সাথে

হ্যান্ডস-ফ্রী হেডসেট যুক্ত করে কথা বলতে আর নিরাপদে গাড়ি ড্রাইভ করার জন্য ব্যবহার করে থাকেন।

যে ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট গুলো এই প্রযুক্তির সাথে চলে তাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটি রেডিও অ্যান্টেনা লাগানো থাকে,

যা সিগন্যাল ট্রান্সমিট এবং রিসিভ উভয়ই করতে পারে—সুতরাং এরা লাগাতার কোন ওয়্যারলেস সিগন্যালকে

প্রেরন এবং গ্রহন করতে থাকে অন্য গ্যাজেট গুলোর সাথে। পুরাতন ডিভাইজ গুলোতে যাতে আগে থেকেই ব্লুটুথ থাকেনা,

এতে এই প্রযুক্তি কাজ করানোর জন্য অ্যাডাপ্টারস লাগানোর প্রয়োজন পড়ে (যেমন পুরাতন ল্যাপটপ

বা ডেক্সটপে ইউএসবি অ্যাডাপ্টার স্টিক লাগানোর প্রয়োজন পড়ে)। ডিভাইজের পাওয়ারের উপর নির্ভর করে ৩ শ্রেণির ব্লুটুথ দেখতে পাওয়া যায়।

ক্লাস ১ হচ্ছে সর্বাধিক শক্তিশালী শ্রেণি, যা ১০০ মিটার পর্যন্ত সিগন্যাল বিস্তার করতে পারে।

ক্লাস ২ আমরা সর্বাধিক ব্যবহার করে থাকি, এটি ১০ মিটারের দূরত্ব পর্যন্ত কাজ করতে পারে এবং

ক্লাস ৩ হলো অনেক কম শক্তিশালী শ্রেণি যা মাত্র ১ মিটার পর্যন্ত কাজ করে।

আরো পড়ুন

ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে?

%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%a5-4

 

ব্লুটুথ প্রযুক্তি রেডিও তরঙ্গ ব্যান্ডে ৭৯ আলাদা আলাদা ফ্রিকুয়েন্সি (চ্যানেল) ব্যবহার করে ডাটা আদান প্রদান করে থাকে—

এবং এটি ২.৪৫ গিগাহার্জের উপর কাজ করে। এই একই ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করে রেডিও, টেলিভিশন,

সেলফোন, এমনকি কিছু মেডিক্যাল যন্ত্রপাতিও কাজ করে থাকে। কিন্তু চিন্তার কোন কারন নেই, আপনার ফোনের

ব্লুটুথ গিয়ে কারো লাইফ সাপোর্ট মেশিনের সাথে গণ্ডগোল পাকাবে না।

কেনোনা আপনার ফোনে বা ডিভাইজে যে ট্রান্সমিটার লাগানো থাকে, তা অনেক কম শক্তিশালী হয়ে থাকে—

ফলে এর সিগন্যাল এতোদূর বহন করে নিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষমতা থাকেনা। এই প্রযুক্তি কম দূরত্বে কাজ করার এটিই হলো সবচাইতে বড় প্লাস পয়েন্ট।

এই প্রযুক্তি অনেক কম পাওয়ার ব্যবহার করে, তাই এর রেঞ্জ অনেক কম হয়ে থাকে—

এবং তাত্ত্বিকভাবে এটি অন্যান্য বেশি রেঞ্জের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি হতে বেশি নিরাপদ (যেমন ওয়াইফাই)।

কিন্তু তারপরেও ব্যাস্তবিকভাবে এর কিছু অসুবিধার দিকও রয়েছে।

ব্লুটুথ ডিভাইজ গুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একে অপরকে সনাক্ত করতে পারে এবং সরাসরি একে

অপরের সাথে কানেক্ট হতে পারে। একসাথে কানেক্ট থাকা ডিভাইজ গুলো একই সাথে একই

সময়ে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। এই ডিভাইজ গুলো কখনোই একে

অপরের কানেকশনে বাঁধা প্রদান করে না—কেনোনা প্রত্যেকে ৭৯ চ্যানেল থেকে আলাদা আলাদা

ফিকুয়েন্সি ব্যবহার করে একে অপরের সাথে পেয়ার করে।

যদি আপনি একটি ডিভাইজের সাথে আরেকটি ডিভাইজ কানেক্ট করতে চান তখন তারা

এলোমেলোভাবে কোন একটি চ্যানেল পিক করে। যদি সেই চ্যানেলটি আগে থেকে আশেপাশে

কোথাও ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে আপনার ডিভাইজ গুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরেকটি চ্যানেল পিক

করবে এবং তার উপরে কাজ করবে (এই টেকনিক কে spread-spectrum frequency hopping বলা হয়ে থাকে)।

যেকোনো ইলেকট্রিকাল যন্ত্রপাতির সাথে বাধাদান করার ঝুঁকি এড়াতে দুটি কানেক্ট থাকা

ডিভাইজ সর্বদা এদের ফ্রিকুয়েন্সি পরিবর্তন করে কাজ করে (এক সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজারবার চ্যানেল পরিবর্তন করে)।

একটি ডিভাইজ আরেকটি ডিভাইজের সাথে কানেক্ট থাকা অবস্থায় এবং ডাটা আদান প্রদান করা

অবস্থায় আরেকটি ডিভাইজ একই সময়ে কানেক্ট হতে পারে এবং তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে রাখতে পারে।

ব্লুটুথ প্রযুক্তি প্রযুক্তিতে একই সময়ে সর্বউচ্চ আটটি ডিভাইজ একই সাথে কানেক্ট থাকতে পারে।

ব্লুটুথ কতটা নিরাপদ?

%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%a5-2

 

ওয়্যারলেস প্রযুক্তি সর্বদাই তারের যোগাযোগ থেকে কম সুরক্ষিত হয়ে থাকে। পুরাতন মুভি গুলোর কথা মনে আছে, যেখানে কোন গুপ্ত এজেন্ট কারো টেলিফোন বার্তালাপের উপর নজর রাখার জন্য টেলিফোন তারের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকে। তারের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ভেদকরা কিন্তু অনেক মুশকিলের কাজ। কিন্তু ওয়্যারলেস প্রযুক্তিতে নিরাপত্তা ভেদকরা অনেক সহজ—কেনোনা এতে সকল তথ্য অনবরত খোলা বাতাসে ভেসে বেরায়। আপনার কাছে যথেষ্ট সিগন্যাল রিসিভ করার যন্ত্র থাকলেই আপনি সহজেই সিগন্যাল পেয়ে যাবেন। যাই হোক, যদি এখন এই সমস্যা দূর করার জন্য ওয়্যারলেস প্রযুক্তিতেইনক্রিপশন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্লুটুথ কতটা নিরাপদ? ওয়াইফাই প্রযুক্তি নিরাপদ রাখার জন্য ইনক্রিপশন ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং এতে আরো অনেক সিকিউরিটি ফিচার রয়েছে (কীভাবে ওয়াইফাই নিরাপদ রাখবেন?)। ব্লুটুথে আপনি নির্দিষ্ট কিছু ডিভাইজের মধ্যে সীমাবদ্ধতা জুড়ে দিতে পারেন, এতে শুধু আপনার নির্দিষ্ট করা বিশ্বস্ত ডিভাইজ গুলো একে অপরের সাথে সম্পর্ক যুক্ত করবে। উদাহরণ স্বরূপ—আপনার ফোনকে শুধু  হ্যান্ডস-ফ্রী হেডসেট যুক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট করে দিলেন, এতে আর কোন ডিভাইজ কানেক্ট করতে পারবে না। এই টেকনিককে ডিভাইজ-লেভেল সিকিউরিটি (device-level security) বলা হয়ে থাকে। আবার আপনি চাইলে, আপনার ব্লুটুথ ডিভাইজ গুলো কি করতে পারবে এবং কি করতে পারবে না তার উপরও নির্দিষ্ট করে দিতে পারেন, একে সার্ভিস-লেভেল সিকিউরিটি (service-level security) বলা হয়ে থাকে।

বন্ধুরা, আপনারা তো জানেনই যে, অপরাধীরা সবসময়ই একটু বেশি বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকে। আপনি সম্ভবত ব্লু-বাগিং(bluebugging) সম্পর্কে শুনেছেন—যার মাধ্যমে খারাপ ব্যক্তি আপনার অজান্তেই আপনার ডিভাইজের উপর নিয়ন্ত্রন নিয়ে ফেলবে। আরো রয়েছে ব্লু-জাকিং (bluejacking)—যার মাধ্যমে যে কেউই যে কারো ডিভাইজে ম্যাসেজ পাঠাতে পারে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মার্কেটিং এ ব্যবহার করা হয়। এবং রয়েছে ব্লু-স্নারফিং (bluesnarfing), যার মাধ্যমে যে কারো ডিভাইজ থেকে ব্লুটুথ ব্যবহার করে যেকোনো তথ্য ডাউনলোড করে নেওয়া যায়। নিঃসন্দেহে আরো অনেক হ্যাকিং পদ্ধতি আছে এবং আসছে, যা ব্লুটুথ নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুত।

ব্লুটুথ প্রযুক্তি ওয়াইফাই থেকে ভালো না মন্দ?

wireless

 

 

আমি জানি আপনারা প্রত্যেকেই প্রায় ব্লুটুথ এবং ওয়াইফাই নিয়ে মনের মধ্যে বিভ্রান্তি লুকিয়ে রেখেছেন—কেনোনা একদিক থেকে এই দুই প্রযুক্তিই একই কাজ করে থাকে। কিন্তু আসলে এরা অনেক ভিন্নভাবে এবং ভিন্ন কাজের জন্য প্রস্তুতকৃত। ব্লুটুথ সাধারনত কম্পিউটার গুলোকে একত্রে লিঙ্ক করতে এবং বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইজ গুলোকে স্বল্প দূরত্বের মধ্যে লিঙ্ক করতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বেশিরভাগ সময় এই প্রযুক্তি অনিয়মিত যোগাযোগ এবং অল্প পরিমানের ডাটা আদান প্রদান করার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিরাপদ এবং অনেক কম ডাটা ব্যবহার করে থাকে। ব্লুটুথ প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ডিভাইজ আরেকটি ডিভাইজের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানেক্ট হতে পারে।

অপরদিকে ওয়াইফাইকে অনেকবেশি রেঞ্জ এবং অনেক বেশি পরিমানে ডাটা আদান প্রদান করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ওয়াইফাই মূলত কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের মধ্যে ডাটা আদান প্রদান করিয়ে থাকে—এবং এই প্রযুক্তি অনেক বেশি রেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যাবহারে অনেক বেশি পাওয়ার এবং প্রসারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে।

সত্যি বলতে ব্লুটুথ এবং ওয়াইফাই দুই জনেই পরিপূরক প্রযুক্তি, এরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—এবং আপনি চাইলে এই দুই প্রযুক্তিকে একত্রে ব্যবহার করে আপনার কাজ আরো সহজ করে নিতে পারেন।

শেষ কথা

মনোযোগ সহকারে আজকের পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আশা করছি এই প্রযুক্তি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানলেন। এই পোস্টটি পড়ার পাশাপাশি যেকোনো প্রশ্নে অবশ্যই আমাকে কমেন্ট করে জানান এবং পোস্টটি শেয়ার করুন।