বিশ্বকাপ জ্বরে চায়ের কাপে ঝড় তোলা তর্কের মূল বিষয় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। আসলে ফুটবলের বাইরেও ভারত-পাকিস্তানের মতই এ দুদেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও যুদ্ধগত কারণে বৈরিতা আছে। তাই আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের ম্যাচ মানেই ভারত-পাকিস্থানের ম্যাচের মত টান টান উত্তেজনাপূর্ণ খেলা।

পরিসংখ্যানঃ

দুদলের খেলায় আসলে কে এগিয়ে? উত্তর প্রায় সমান তবে জয়ের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা সামান্য এগিয়ে। [Reference]  দুদলের মধ্যেকার ৯৫ টি খেলার মধ্যে আর্জেন্টিনা ৩৬ ও ব্রাজিল ৩৫ টি ম্যাচে জয়ী হয়। বাকী ২৪ টি ম্যাচ ড্র হয়। দুদলের খেলায় মোট গোলের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা এগিয়ে। আর্জেন্টিনার মোট সংগ্রহ ১৫১ টি গোল অন্যদিকে ব্রাজিল দেয় ১৪৫ টি গোল।

এবার আসা যাক মূলধারার ম্যাচগত ফলাফলের পরিসংখ্যানে।

টুর্নামেন্টের নাম আর্জেন্টিনা ব্রাজিল
বিশ্বকাপ
অলেম্পিক স্বর্ণজয়
কোপা আমেরিকা ১৪
কনফেডারেন্স কাপ
U-২০ বিশ্বকাপ
U-১৭ বিশ্বকাপ 0
মোট জয় ২৫ ২৫

কিছু ইতিহাসিক ম্যাচ ও ঘটনাঃ

১৯৩৭ এর ঘটনাঃ

ঘটনাটা সাউথ আমেরিকান চাম্পিয়ানশীপের। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা ব্রাজিলিয়ানদের ম্যাকিওটোস (অর্থঃ ছোট বানর) বলে টিটকারী মারত। ফাইনাল ম্যাচের প্রথম ৯০ মিনিটে দুদল গোলশূণ্য থাকে। বাড়তি সময়ে আর্জেন্টিনা ২ গোল দেয়। ১ টি বিতর্কিত গোল এবং আর্জেন্টাইন সমর্থকদের শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণের প্রতিবাদ ও নিরাপত্তাজনীত কারণে ম্যাচটি অফিসিয়ালী শেষ হবার আগেই ব্রাজিল মাঠ ত্যাগ করে।

১৯৩৯ এর ফাঁকা মাঠে গোল ঘটনাঃ

রিও ডি জেনিরো তে কোপা কাপে দুদলের মধ্যে দুটো খেলা হয়। প্রথম খেলায় আর্জেন্টিনা ৫-১ গোলে জয়লাভ করে। দ্বিতীয় ম্যাচের শুরুতে ব্রাজিল ১-০ তে এগিয়ে যায় এরপর আর্জেন্টিনা ২-১ এ এগিয়ে যায়। শেষে ২-২ গোলে ব্রাজিল সমতা ফিরিয়ে আনে। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের শেষ মূহূর্তে রেফারী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি পেনান্টি দেয় বিপরীতে আর্জেন্টাইন খেলোয়ার লোপেজ রেফারীকে গালি দিয়ে বসে। এই পেক্ষিতে পুলিশ এসে লোপেজকে ধরে নিয়ে যায়। পুলিশের এহেন কর্মকান্ড এবং রেফারীর সীদ্ধান্তের প্রতিবাদে আর্জেন্টিনা মাঠত্যাগ করে এবং গোলকিপারহীন ফাঁকামাঠে ব্রাজিল পেনাল্টি শ্যুট করে ৩-২ এ জয়লাভ করে।

১৯৪৫ ও ৪৬ এর ঘটনাঃ

১৯৪৫ সালের খেলায় ব্রাজিল ৬-২ গোলে এগিয়ে ছিল। ব্রাজিলের খেলোয়ার মেনেজ ফাউল করে আর্জেন্টাইন খেলোয়ার বাটাগ্লিরোর পা ভেঙ্গে দেয়। যদিও এটা নিছক দুর্ঘনা ছিল, তবে পুরো খেলাটায় মারাত্মক সহিংসতা পরিলক্ষিত হয়। কয়েকমাস পরে দক্ষিণ আমেরিকা চাম্পিয়নশীপের ফাইনালে দুদল আবারো মুখোমুখি হয়। এই খেলাটিও সহিংস হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছিল। খেলার ২৮ মিনিটির মাথায় ব্রাজিলের খেলোয়ার পিন্টো ফাউল করে আর্জেন্টাইন ক্যাপ্টেন জোসি স্যালোমন এর পায়ের টিবিয়া ফিবুলা ভেঙ্গে ফেলেন। এনিয়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থক ও পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সমর্থকরা মাঠে এবং ড্রেসিং রুমে হামলা চালায়। যদিও এ ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে জয়লাভ করে কিন্তু ক্যাপ্টেন জোসি স্যালোমন তার ভাঙ্গা পা কখনোই সেরে উঠাতে পারেননি এবং পরবর্তী জীবনে আর কোন পেশাদার ফুটবল খেলায় অংশ নিতে পারেননি।

বিশ্বকাপ ১৯৭৮ (দি ব্যাটল অফ রোজারিও)

বিশ্বকাপের ফাস্টরাউন্ডে ব্রাজিল পেরুকে ৩-০ গোলে হারায়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা পোলান্ডকে ২-০ গোলে হারায়। এরপর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের খেলায় ড্র হয় এবং সকলেই ৩ পয়েন্ট পায়। পরবর্তীতে ব্রাজিল-পোল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা-পেরুর খেলা পরে। আর্জেন্টিনার খেলাটি ব্রাজিলের খেলার কয়েকঘন্টা পরে হওয়ায় আর্জেন্টিনার সুবিধা ছিল ব্রাজিলের খেলা অনুসারে হিসাব কষে খেলবার। ব্রাজিল-পোল্যান্ড খেলায় ব্রাজিল ৩-১ গোলে জয় পায় ফলে পয়েন্টের খেলায় ব্রাজিলকে টপকাতে আর্জেন্টিনার ৪ গোল দিতে হোত। খেলার প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে  পেরু আরো ৪টি গোল খায় এবং আর্জেন্টিনা ৬-০ তে জয়লাভ করে। গুজব আছে এ খেলায় পেরু ইচ্ছে করেই আর্জেন্টিনা কে সুযোগ করে দেয় বিশেষ করে পেরুর গোলকিপার র‌্যামোনের দিকে সন্দেহের তীর ছোটে যার জন্ম আর্জেন্টিনায়। তবে ম্যাচ পাতানো প্রমাণিত না হওয়ায় আর্জেন্টিনা এবং নেদারল্যান্ড ফাইনালে যায় আর ব্রাজিল ৩য় স্থান অধিকার করে। তবে ব্রাজিলের কোচ কোতিনহো নিজের দলকে “মোরাল চাম্পিয়ন” হিসাবে উল্লেখ করেন যেহেতু ব্রাজিল কোন ম্যাচ না হেরেও ৩য় স্থান পায় এবং তার দাবীমতে ফিক্সিং করে আর্জেন্টিনা ফাইনালে যায়। ১৯৭৮ এর বিশ্বকাপ সবচেয়ে বিতর্কীত বিশ্বকাপ যেখানে আর্জেন্টিনা জয়ী হয়।

১৯৮২ এর বিশ্বকাপঃ

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও ইতালির রোমাঞ্চকর প্রতিযোগীতা চলছিল। ইতালী ২-১ এ এগিয়ে থাকায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ের প্রয়োজন ছিল। তবে ব্রাজিল প্রকৃত ফুটবলের চেয়ে খেলোয়ারদের আক্রমণ করতেই বেশী ব্যস্ত ছিল ম্যাচে। ৩-১ গোলে ব্রাজিলের জয়লাভের পর বাজে রেফারীং ও পরাজয়ের হতাশা থেকে ডিয়াগো ম্যারাডোনা ব্রাজিলের খেলোয়ার বাতিস্তা কে লাথি মেরে বসেন এবং লাল কার্ড খেয়ে মাঠ ত্যাগ করেন।

বিশ্বকাপ ১৯৯০

”হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল” নামে পরিচিত। এটিই শেষ বিশ্বকাপ যেখানে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল মুখোমুখি হয়। ম্যারাডোনার দেয়া পাসে গোল করে ১-০ তে নিজেদের এগিয়ে নিজে যান আর্জেন্টাইন খেলোয়ার ক্যানিগ্যিয়া। তবে গুজব রটে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়ার ব্রানকো কে নিয়ে যিনি দাবী করেন আর্জেন্টাইন ফুটবল স্টাফ তাকে ঘুমের অষুধ মিশ্রিত পানি খাওয়ায়। আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও কোচ অবশ্য ”হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল” কে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।

শেষকথাঃ

ব্রাজিল আর্জেন্টিনা দুটোই সেরা দল এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোন বিবেচনায় নিজ সমর্থকদের কাছে দুটো দলই শ্রেষ্ট। পোষ্টের বিষয় কোন দলের সমালোচনা বা শ্রেষ্টত্ব প্রমাণ নয় কেবল ঘটনার বর্ণনা মাত্র।

[উইকিপিডিয়া তথ্যকোষ অনুসারে রচিত।]